মা ও শিশু

ভবঘুরে মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণী (২০) নিরাপদে হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন

কয়েকজন উদ্যমী যুবকের সহায়তায় পাবনার সাঁথিয়া-বেড়া এলাকার এক ভবঘুরে মানসিক প্রতিবন্ধী তরুণী (২০) নিরাপদে হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন। জেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শনিবার (১৩ জুন) ফুটফুটে ছেলে সন্তান প্রসব করেন ওই তরুণী। তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তিসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ করেছেন সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার সংযোগস্থল কাশীনাথপুরের কয়েকজন উদ্যমী যুবক। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়ার পর ওই তরণীর স্থায়ীভাবে থাকা-খাওয়ার দায়িত্বও নিয়েছে স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই তরুণী দীর্ঘদিন ধরে সাঁথিয়া, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার সংযোগস্থল কাশীনাথপুর, বিরাহিমপুর, চব্বিশমাইল, দুলাইসহ বিভিন্ন বাজারে ঘোরাফেরা করতেন। তার নাম-ঠিকানা স্থানীয় কেউ জানেন না। স্থানীয় হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় মাঝে মধ্যে খাবার জুটতো তার। মানসিক প্রতিবন্ধী, তাই যেখানে রাত সেখানেই কাত। এটাই কাল হলো ভবঘুরে প্রতিবন্ধী ওই তরুণীর। কে বা কারা তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। এতে মানসিক প্রতিবন্ধী ওই তরুণী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।

গত ৬ জুন অন্তঃসত্ত্বা ওই তরুণীকে দেখে তার কয়েকটি ছবি তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন স্থানীয় যুবক স্বপন খন্দকার। তিনি ওই তরুণীকে মানবিক সাহায্যের আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দেন কাশীনাথপুরের কয়েকজন মানবদরদি যুবক। মানসিক প্রতিবন্ধী ওই তরুণী যাতে নিরাপদে মা হতে পারেন সে ব্যাপারে এগিয়ে আসেন তরুণ ব্যবসায়ী ও কলেজশিক্ষক শফিকুল আলম খান টিটুল।

এছাড়া বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আল আমিন, ডিএমপির সাব-ইন্সপেক্টর শেখ সজীব, পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক এম ডি সুজন, প্যাথলজিস্ট আলো এবং বিডি এভারগ্রিনের শেখ শাহিন ও কৌশিক আহমেদ অনিক। তারা ওই তরুণীর মা হওয়া থেকে শুরু করে তার খাদ্য-ওষুধসহ সব কিছুর ব্যবস্থা করেন। তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক শনিবার (১৩ জুন) পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের সুজানগর উপজেলার দুলাই-চিনাখড়ার মধ্যবর্তী গুচ্ছগ্রামের কাছ থেকে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে কাশীনাথপুরে নিয়ে আসা হয়।

কলেজশিক্ষক শফিকুল আলম খান টিটুল জানান, ওই তরুণীকে মোটরসাইকেল নিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা ধরে খুঁজে বের করা হয়। এরপর তাকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে আসা হয়। তাদের মালিকানাধীন মার্কেটের ক্লিনিক (পদ্মা হাসপাতাল (প্রা.) মালিককে তিনি আগেই বিষয়টি বলে রেখেছিলেন। তিনিও সহযোগিতা করেছেন। ক্লিনিকে ভর্তির পর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শনিবারই সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোর সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসক। সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বিকেলে ওই তরুণী ছেলে সন্তান প্রসব করেন।

ওই তরুণীকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া স্বপন খন্দকার বলেন, কয়েকদিন আগে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ওই তরুণীকে দেখে আমরা সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সমাজসেবার পাবনা অফিস থেকে এ নিয়ে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। তাই স্থানীয় ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানাই। তারপর সবার সহযোগিতায় শনিবার মেয়েটির চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এখন নিজের কাছে অনেক ভালো লাগছে। অন্তত একটি ভালো কাজ করতে পেরেছি।

কলেজশিক্ষক শফিকুল আলম খান টিটুল বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে মানবিক কারণেই আমি পাশে দাঁড়িয়েছি। আমাদের মার্কেটের ক্লিনিক মালিককে বলেছিলাম। তারাও প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এগিয়ে এসেছে। তবে সেইসব নরপশুদের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে যারা মানসিক ভারসাম্যহীন একটি মেয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার সর্বনাশ করেছে।

তিনি আরও বলেন, এখন প্রতিবন্ধীর ছেলে সন্তানটির দায়িত্ব নেয়ার লোকের অভাব হচ্ছে না। কয়েকজন নানা ফন্দি ফিকির করে এরই মধ্যে শিশুটিকে নিতে এসেছিল। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বাচ্চা নিতে এসে জেরার মুখে ভয়ে পালিয়ে গেছে। তবে মেয়েটির কী হবে? আমরা কতদিন তকে রাখতে পারব? এসব নিয়ে ভাবনার অন্ত ছিল না আমাদের। তখন আরেকটি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন কাশীনাথপুরের অদূরের সিন্থি পাঠশালার পরিচালক প্রকৌশলী সবুজ খান। সিন্থি পাঠশালা তথা সিন্থি বাড়ির পরিচালক প্রকৌশলী সবুজ খান বলেছেন- শিশুটির দায়িত্ব অনেকেই নেবেন। কিন্তু ওই তরুণীর দায়িত্ব তো কেউ নেবেন না। তাই তিনি ওই তরুণীকে তার সিন্থি বাড়িতে আশ্রয় দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

শফিকুল আলম খান টিটুল বলেন, ওই তরুণী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলে সিন্থি বাড়িতে রেখে আসা হবে। দুমুঠো খাবারের জন্য হয়তো তার আর পথে পথে ঘুরতে হবে না, হারাতে হবে না সম্ভ্রম।

পাবনার বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আলহাজ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, যুব সমাজের এমন মানবিক কার্যক্রম আমাদের আশান্বিত করে। দায়িত্বশীলরা মেয়েটির খোঁজ না রাখলেও সমাজের কিছু উদ্যমী যুবক সে কাজটি করেছেন তাদের এমন মহতি কাজ অনুজদের অনুপ্রাণিত করবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close