পথশিশু

পথশিশুরা করোনা ঝুঁকি নিয়েই খাদ্যের সন্ধানে ঘুরছে

করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী মহামারি চলছে। সাধারণ ছুটির ক্ষেত্রে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মের জন্য কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়ার বিষয়টি হালকা করা হচ্ছে। করোনা থেকে নিজেদেরকে ঘরবন্দি করে রাখলেও ছিন্নমূল পথশিশুদের ক্ষুধা মিটাতে পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে পথশিশুদের দেখার কেউ নেই। নেই ওদের থাকার জন্য নিদিষ্ট কোন জায়গা, যেখানে রাত সেখানেই কাত হয়ে ঘুমাচ্ছেন। তবে ওদের মূল ঠিকানা রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ফ্লাইওভারের নীচে, হাইকোর্টের মাজারের সামনে সামান্য একটু ঘুমানোর জায়গা মিললেই ঘুমিয়ে যাচ্ছেন। করোনা নামের বিষয়টি কানে আসে কিন্ত কোন ভয় কাজ করে না।

এ বিষয়ে জুম বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা পথশিশুদের বিভিন্ন পয়েন্টে করোনা বিষয়ক ধারণা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন, জুম বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস টি সাহিন। তিনি গতকাল রোববার দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, রাজধানীর, হাইকোর্ট, শাহবাগ, উসমানী উদ্যান, সেগুনবাগিচা, রমনাপার্ক, কাকরাইল এলাকার প্রায় ৪৫০জন পথশিশু নিয়ে কাজ করে আসছি। করোনা প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এসব শিশুদের নানাভাবে সর্তকতামূলক দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেক শিশু নগরীর বস্তিতে বসবাস করে জুম বাংলাদেশেই স্ব-পরিবারে পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের সাহায্য সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পরিচালিত ছয়টি শিশু বিকাশ কেদ্রে দুস্থ ও পথশিশুদের জন্য সামাজিক কার্যক্রম ছিল? সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এর মাধ্যমে এক লাখের বেশি শিশুকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়েছে? শহুরে শিশুদের বাল্যবিবাহ থেকে মুক্ত থাকা, শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন শর্তে গত কয়েক বছরে ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে? সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১১টি জেলা শহরে শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা সুবিধা পেয়ে আসছিল। নানা করণে এসব কর্মকা- আগের চেয়ে সীতিত হয়েছে।

জানা গেছে, ঘরহীন পথশিশুরা দল বেঁধে ঘুরছে, খেলছে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ফ্লাইওভারের নিচে ফুটপাতে জটলা করছে, পাশাপাশি জড়াজড়ি হয়ে ঘুমাচ্ছে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, তেজগাঁও রেলস্টেশন, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড, শাহজাহানপুর ফ্লাইওভার, রমনা পার্কসহ বিভিন্ন স্থানে পথশিশুদের জটলা করে খেলতে কিংবা আড্ডা দিতে দেখা গেছে। সবকিছু বন্ধ থাকায় এদের নিয়মিত খাবারও জুটছে না। কমলাপুরে জটলা করে আড্ডা দিচ্ছিল কয়েকজন। ওদের কারো কারো মুখে বা গলায় মাস্ক ঝুলানো রয়েছে, কারো কোন মাস্ক নেই। ওদের একজন মোতাহার। কমলাপুরে আসা বিভিন্ন গাড়ি পরিষ্কার করে খাবার টাকা জোগাড় করে। এখন বাস চলাচল বন্ধ তাই কোন কাজ নেই। এখানে থেকে বাস পাহারা দিতে হয়। করোনাভাইরাস সম্পর্কে জানতে চাইলে সে বলে, শুনছি করোনা রোগে কারণে সব বন্ধ কইরা দিছে। আমরা তো অহন না খাইয়া মরতাছি, কোনো কাম কাজ নাই। আমরা অহন কই যাইয়াম।

দেশে পথশিশুর সংখ্যা কত সে বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এসব পথশিশুর নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে সুরক্ষা না দেওয়া হলে এসব শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আরো অনেক বেশি বাড়বে।

এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মো. নুরুল বাসির বলেন, দেশের সব পথশিশুকে হঠাৎ করেই একটা সিস্টেমের মধ্যে একবারে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। কারণ এতটা অবকাঠামোগত সুবিধা আমাদের নেই। আবার আমাদের কাজের মধ্যে আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এখন যে সময়, তাদের তো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সেখানেও আমরা আবার যাতে বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতি তৈরি করে না ফেলি, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যে অবকাঠামোগত যা সুবিধা আছে, তার মধ্য দিয়েই চেষ্টা করে যাচ্ছি।

পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন দুটি প্রথম সারির বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু পথশিশু আছে যারা বিভিন্ন প্রতিকূল সময়ে নিজেরাই বিভিন্ন হোম কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু অনেক পথশিশু রয়েছে, যারা পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম মনে করছেন, দেশে যে এখনো বিপুলসংখ্যক পথশিশু রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের পুনর্বাসনের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটাও অপ্রতুল। করোনা মহামারি যেভাবে ছড়িয়েছে, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। সারা বাংলাদেশেই পথশিশুরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পথশিশুরা আয়-উপার্জন করে না। অন্য কারো করুণায় চলে। এখন সবকিছুই বন্ধ। ওরা এক ধরনের বিপদে পড়ে গেছে।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এর চিত্র আমাদের ধারণার বাইরে চলে যাচ্ছে। সাংবিধানিকভাবে তাদের অধিকার আছে। রাষ্ট্র এত বছর পরও যদি কাঠামো তৈরি করতে না পারে, এটা দুঃখজনক।

অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান পথশিশুদের নিয়ে সম্প্রতি এক মন্তব্যে বলেন, করোনাভাইরাস কীভাবে ছড়ায়, সে বিষয়ে পথশিশুদের মধ্যে ধারণা কম। এটি তাদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। কিছু আছে এ সমস্যা জানার পরও বাধ্য হয়ে রাস্তায় বের হয়। পেটে খাবার নেই, কী করবে।

সার্বিক বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, যারা পথশিশু, তারা তো ঝুঁকির মধ্যে আছেই। সেটি তাদের জীবনযাপনের সংকট ও অবাধ চলাফেরার কারণেই। তাদের পরীক্ষা করাতে আসবে, সেটার সম্ভাবনাও কম। সময় থাকতেই এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, পথশিশুদের সংক্রমণের হার কম। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঝুঁকিতে আছে এরা। কেননা এই সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান নেই।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close