বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রমের প্রচলন বাড়ছে বার্ধক্য যেন বোঝা না হয়

বৃদ্ধাশ্রম তখনই ইতিবাচক যখন সেটা সন্তানহীন এবং সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য হয়। কিন্তু বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রম খানিকটা প্রচলনে পরিণত হয়েছে। সন্দেহ নেই, এমন চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এটা একচেটিয়া রূপ ধারণ করবে। বৃদ্ধাশ্রমে সম্বলহীন নিঃসন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিত্তবান পরিবার থেকে আসা বাবা-মায়ের সংখ্যাও কম নয়। এমতাবস্থায় বৃদ্ধাশ্রম সংস্কৃতিতে পরিণত হয় কিনা সে আশঙ্কা করাও অসঙ্গত নয়।

দেশে মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে সম্পর্ক অথবা পুত্রবধূ, শ্বশুর, শাশুড়ি সম্পর্কের মতো মধুর সম্পর্কগুলো ছিটকে পড়া পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে আর সেই সঙ্গে প্রসার ঘটছে বৃদ্ধাশ্রমের মতো দীর্ঘশ্বাসের জায়গার। আর আগামী প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে সুন্দর স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশ থেকে। সুষ্ঠু পারিবারিক পরিবেশ বা পারিবারিক বন্ধনের অনুপস্থিতি বর্তমান প্রজন্মের একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতায় ভোগার একটি বড় কারণ হতে পারে। যার ফলস্বরূপ আমাদের দেখতে হয় আত্মহননের মতো নানান অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।

বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং আত্মীয়পরিজন নিয়ে গড়ে ওঠা সুষ্ঠু পারিবারিক বন্ধন সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তানদের মধ্যে এ একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতায় ভোগার আশঙ্কা থাকে না। কারণ তারা সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না বা যেকোনো সমস্যায় তাদের পরিবারের সদস্যদের পাশে পায়। কিন্তু বাবা-মা বা দাদা-দাদিকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা পরিবারে সুষ্ঠু পারিবারিক বন্ধন বা সুষ্ঠু পারিবারিক পরিবেশ বিদ্যমান না থাকায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সেই সুযোগটা থাকছে না। মায়ের সেই দশ মাস দশ দিনের অপেক্ষার পালা শেষ করে আঁতুড়ঘর থেকে বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত মেনে নেওয়া সমস্ত আবদার, একটু অসুখ হলেই নিজে না ঘুমিয়ে সন্তানের জন্য রাতজাগা, ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠে সন্তানের জন্য সবকিছু পরিপাটি করে সাজানো, সন্তান না খাওয়া পর্যন্ত না খেয়ে থাকা, বাবার হাত ধরে পৃথিবী চেনার সে দিনগুলোসহ তাদের সমস্ত ত্যাগকে পেছনে রেখে সন্তান যখন তার মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে উদ্যত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবতা হয় পদদলিত।

বাবা-মায়ের সারাজীবনের ত্যাগ তিতীক্ষা তখন কাঁদতে থাকে গুমরে গুমরে। ঘরের মাঝে জায়গা পায় অবলা পশুপাখিও। কিন্তু মস্ত ফ্ল্যাটে জায়গার কমতি পড়ে মা বাবার জন্য। সন্তানের কাছে বোঝা হয়ে পড়েন বাবা-মা। অবশেষে বাবা-মায়ের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। আবার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠালেও অযত্নে-অবহেলায় ঘরের এক কোণে ফেলে রাখার সন্তানের সংখ্যা এ সমাজে কম নয়।

পরিবার আমাদের, বাবা-মা আমাদের, সন্তান-সন্ততিও আমাদের, আবার আমাকে ও আপনাকেও বৃদ্ধ হতে হবে, যেতে হতে পারে বৃদ্ধাশ্রমে। সঙ্গত কারণেই দায়ভার ও আমাদের ওপরেই বর্তায়।

যদি ‘নেতিবাচক বৃদ্ধাশ্রম’ (বৃদ্ধাশ্রম যখন নিঃসন্তান বা সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য না হয়) এর প্রচলন রোধ করতে চাই সেটা আপনি আমাকেই করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা। সন্তানদের ভারি ভারি বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে মগজ ধোলাই করা অথবা মার্জিত ভাষায় কথা বললে একাডেমিক শিক্ষা দেওয়ার আগে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কারণ নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি কখনও নির্দয়-নৃশংস কাজ বা ব্যবহার করতে উদ্যত হয় না।

আমরা নেতিবাচক বৃদ্ধাশ্রমকে ‘না’ বলি এবং এর প্রচলন রোধ করি যেন এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশে পরিণত না হয়। কোনো বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা যেন না হয় বৃদ্ধাশ্রম। বার্ধক্য যেন কোনোভাবেই বোঝা না হয়ে ওঠে সেই দিকে মনোযোগী হই। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা বজায় রাখতে কাজ করি। প্রতিটি বাবা-মায়ের শেষ বয়স হোক শ্রদ্ধা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

নূরানী নাহরিন মিম : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close