কিংবদন্তী

মহানায়ক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

 ম্যাক্সিম গোর্কির ‘বুড়ি ইজেরগিল’ গল্পের শেষ অংশে দেখা মেলে হার না মানা এক বীরের। নাম ডানকো। স্তেপ জাতি যখন বিপদসংকুল, তখন ডানকো বীরদর্পে তাদের নেতৃত্ব দিলেন। স্তেপ জাতির ওপর বাইরের শত্রুরা যখন আক্রমণ চালাল, তখন তাদের বাঁচার উপায় জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যাওয়া। ডানকোর নেতৃত্বে তারা জঙ্গলের গাছ কেটে এগোতে লাগল। কিন্তু যতই গভীর জঙ্গলের দিকে এগোচ্ছে বিপদসংকুলতা ততই বাড়ছিল। একসময় এমন অন্ধকার ঘিরে এলো, মনে হলো জঙ্গলের আদিকাল থেকে সবগুলো আঁধার রাত এক জায়গায় এসে জড়ো হয়েছে। সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকার আর কোনো আশাই রইল না। ব্যর্থতায় হতাশায় তাদের ক্রোধ গিয়ে পড়ল ডানকোর ওপর। তখন সবাই ডানকোকে মেরে ফেলতে চাইল। কিন্তু ডানকো হার না মেনে নিজের হৃদয় চিরে উঁচিয়ে ধরলেন। সূর্যের মতো জ্বলতে থাকল হৃদয়টা, সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল। সারাটা জঙ্গল স্তব্ধ হয়ে গেল মানুষের প্রেমের সেই মহান আলোয়। মানুষগুলো বিমূঢ় হয়ে পড়ল ‘চলো, এগিয়ে চলো’ চিৎকার করে উঠল ডানকো। সেই আলোয় জঙ্গল থেকে মুক্তি পেল সবাই। কিন্তু ডানকো মৃত্যুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রতিদানের পরিবর্তে পাশে জ্বলতে থাকা তার হৃদয়টাকেও একজন মাড়িয়ে দিল।

ডানকোদের ন্যায় বীররা যুগে যুগে জন্মান না। যখন জন্মান তখন তারা মৃত্যুকে উপেক্ষা করে জাতির জন্য নিজেকে আত্মোৎসর্গ করেন। তেমনি মহানায়ক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি বাঙালি জাতির আলোকবর্তিকা হিসেবে উদয় হয়েছিলে। তার রাজনৈতিক জীবনে চার হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারাভোগ করেন। বাকি চার হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। ভাগ্য বিড়ম্বিত বাঙালি অনাহারে থাকে, বাংলার মানুষের মুখে হাসি নেই, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন; সেই ক্রান্তিকালকে মোকাবিলা করে বাঙালির মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার একমাত্র ব্রত। তাই তো তিনি নিজের জন্ম দিনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বলেছেন: ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস!’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা: ২০৯; ১৭ মার্চ ১৯৬৭, শুক্রবার)

১৯৭১ সালে প্রখ্যাত শিল্পী, লেখক ও ছড়াকার লক্ষ্মীকান্ত রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ গানটি গেয়েছিলেন,

‘স্বাধীনতাকামী মানুষের পরিত্রাতা কে?

সাত কোটি বাঙ্গালীর ভাগ্য বিধাতা কে?

একটি সুরেতে কে দিয়েছে বেঁধে বাঙ্গালীর অন্তর?

সে তো শেখ মুজিব! ধন্য মুজিব!’

চলছে অগ্নিঝরা মার্চ। মার্চ এলেই কানে বাজতে থাকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। ৪৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে। সেদিনের ১৮ মিনিটের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলেছিলেন। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকো।’ অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। জনসভার এমন অনেকে বলেছেন, লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত স্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নীরবতা। ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো। এ ভাষণেই বাংলাদেশ জন্মের সৃষ্টি হয়। তাই ইউনেস্কোর একটি উপদেষ্টা কমিটি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে দেওয়া বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ধরনের দলিলগুলো যে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সে তালিকায় এ ভাষণটিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশিদের জন্য এ এক গর্বের বিষয়।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে ব্যক্তিটির এত অবদান তাকেও রেহাই দেয়নি কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য। ডানকোর ন্যায় তাকেও মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু যারা দেশ মাতৃকার জন্য, দেশের জনগণের জন্য লড়েন তাদের কখনও মুছে ফেলা যায় না। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম থাকবে।

‘মুজিববর্ষে’ আমাদের প্রত্যাশা গত ৪৮ বছরের পুঞ্জীভূত সব অপূর্ণতা, ব্যর্থতা ও গ্লানি মুছে ফেলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে চলমান অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

এমদাদুল হক সরকার

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close